গ্রহাণুর ভয়াবহ আঘাতে ডাইনোসর বিলুপ্ত হলেও যেভাবে বেঁচে যায় অন্য প্রাণীরা
প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে পৃথিবীর ইতিহাসে ঘটে যায় অন্যতম ভয়াবহ একটি ঘটনা। মহাকাশ থেকে আসা বিশাল এক গ্রহাণুর আঘাতে মুহূর্তেই বদলে যায় পৃথিবীর পরিবেশ। এই বিপর্যয়ের পর ডাইনোসরসহ অসংখ্য প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেলেও কিছু ছোট প্রাণী আশ্চর্যজনকভাবে টিকে থাকতে সক্ষম হয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, আকার, খাদ্যাভ্যাস ও পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাই ছিল তাদের বেঁচে থাকার মূল রহস্য।
গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, গ্রহাণুর আঘাতে পৃথিবীতে ব্যাপক অগ্নিকাণ্ড, তীব্র তাপপ্রবাহ ও ভয়ংকর সুনামির সৃষ্টি হয়েছিল। সংঘর্ষের ফলে আকাশে ধুলা ও বিষাক্ত কণার স্তর তৈরি হয়, যা দীর্ঘ সময় সূর্যের আলো আটকে রাখে। এতে পৃথিবীর আবহাওয়া দ্রুত বদলে যায় এবং গাছপালা ধ্বংস হতে শুরু করে। এর প্রভাব পড়ে পুরো খাদ্যশৃঙ্খলে।
বিশাল আকৃতির ডাইনোসররা এই দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বিজ্ঞানীদের মতে, বড় শরীরের কারণে তারা সহজে আশ্রয় নিতে পারেনি এবং বিপুল পরিমাণ খাদ্যের প্রয়োজন হওয়ায় দ্রুত সংকটে পড়ে। টাইরানোসরাস রেক্স বা ট্রাইসেরাটপসের মতো প্রাণীরা গ্রহাণুর আঘাতের পর সৃষ্ট পরিবেশগত পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে ব্যর্থ হয়।
অন্যদিকে ছোট আকারের স্তন্যপায়ী প্রাণী, টিকটিকি ও কিছু জলজ প্রাণী তুলনামূলক নিরাপদে থাকতে পেরেছিল। এদের অনেকে মাটির নিচে গর্ত করে বা পাথরের ফাঁকে আশ্রয় নেয়। কচ্ছপ ও কিছু মাছ পানির নিচে অবস্থান করে প্রাথমিক বিপদ এড়িয়ে যায়। ছোট শরীরের কারণে এদের খাদ্যের চাহিদাও কম ছিল।
বর্তমান পাখিদের পূর্বপুরুষদের বেঁচে থাকার পেছনেও ছিল বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য। তারা সহজে উড়তে পারত, দ্রুত নিরাপদ স্থানে যেতে সক্ষম ছিল এবং খাবার খুঁজে নেওয়ার ক্ষমতাও বেশি ছিল। এ ছাড়া তাদের ছানারা দ্রুত বড় হয়ে উঠত, ফলে দীর্ঘদিন খাবার জোগাড়ের চাপ কম থাকত।
গ্রহাণুর আঘাতের পর বহু বছর পৃথিবীতে পর্যাপ্ত সূর্যালোক পৌঁছায়নি। এতে গাছপালা ধ্বংস হয়ে তৃণভোজী প্রাণীদের খাদ্য সংকট দেখা দেয়। এরপর একে একে মাংসাশী প্রাণীরাও বিলুপ্ত হতে শুরু করে। তবে যেসব প্রাণী বীজ, পোকামাকড় বা বিভিন্ন ধরনের খাবার খেতে পারত, তারা তুলনামূলক সহজে টিকে যায়।
সমুদ্রের গভীর অংশও পুরোপুরি নিরাপদ ছিল না। প্ল্যাঙ্কটন ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়ে। বড় সামুদ্রিক প্রাণীদের অনেকেই মারা যায়। কিন্তু কিছু সহনশীল প্রাণী মৃত জৈব পদার্থ খেয়ে বেঁচে থাকতে সক্ষম হয়। সামুদ্রিক স্পঞ্জ ও কিছু হাঙর প্রজাতি এভাবে টিকে ছিল বলে ধারণা করা হয়।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, যেসব প্রাণী পরিবেশের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারত এবং খাদ্যের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো উৎসের ওপর নির্ভরশীল ছিল না, তাদের টিকে থাকার সম্ভাবনা বেশি ছিল। দ্রুত বংশবৃদ্ধি ও অভিযোজন ক্ষমতাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ।
গবেষকদের মতে, সেই প্রাগৈতিহাসিক বিপর্যয় আজকের পৃথিবীর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত সংকটের সময় কোন ধরনের প্রাণী বেশি টিকে থাকতে পারে, সে বিষয়েও এই গবেষণা নতুন ধারণা দিচ্ছে।
প্রতি / এডি / শাআ









